মাদ্রাসার দাখিল-আলিমের ছাত্রীদের ফুটবল দল গঠনের নির্দেশনা

 


মাদ্রাসার দাখিল-আলিম শ্রেণির ছাত্রীদের দিয়ে ফুটবল দল গঠনের নির্দেশনা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, ধর্মীয় চেতনা থেকেই অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের মাদ্রাসায় পড়াতে পাঠান। মাদ্রাসাগুলোই গড়ে উঠেছে ইসলামী চেতনার আলোকে। যেখানে পর্দা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এমন পরিস্থিতিতে ছাত্রীদের ফুটবল খেলায় অংশগ্রহণ করানোটা সাংঘর্ষিক।

জানা গেছে, প্রাইম মিনিস্টার্স গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট-২০২৬ উপলক্ষ্যে ৬ষ্ঠ থেকে আলিম পর্যন্ত শ্রেণিভিত্তিক ছাত্র-ছাত্রীদের দিয়ে ফুটবল দল গঠনের নির্দেশনা দেয় বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড। সম্প্রতি বোর্ডের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক এস এম তৌহিদুজ্জামানের সই করা একটি বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

‘মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা ইসলামী আদর্শ ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। সেখানে কোনো কর্মসূচি গ্রহণের আগে ধর্মীয় ও সামাজিক সংবেদনশীলতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ক্রীড়া কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে এমন আয়োজন বেছে নেওয়া যেতে পারে, যা মাদ্রাসা শিক্ষার বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়।’

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, আগামী ৯ আগস্ট চট্টগ্রাম স্টেডিয়ামে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রাইম মিনিস্টার্স গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট-২০২৬-এর শুভ উদ্বোধন করবেন। উক্ত ফুটবল টুর্নামেন্ট সারা বাংলাদেশে একই তারিখ ও সময়ে একযোগে শুরু হবে। এ লক্ষ্যে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফুটবল দল গঠন করা এবং দলকে প্রস্তুত করার জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। এ প্রেক্ষিতে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য বলা হলো।

নির্দেশনাগুলো হলো— শিক্ষার্থীদের মধ্যে খেলাধুলার আগ্রহ বৃদ্ধি এবং দক্ষ খেলোয়াড় নির্বাচনের লক্ষ্যে শ্রেণিভিত্তিক আন্তঃশ্রেণি ফুটবল প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে যোগ্যতার ভিত্তিতে দাখিল (৬ষ্ঠ-১০ম) শ্রেণির একটি ছাত্র ও একটি ছাত্রী এবং আলিম (১ম বর্ষ ও ২য় বর্ষ) শ্রেণির একটি ছাত্র ও একটি ছাত্রী ফুটবল দল গঠন করতে হবে। গঠিত দলের জন্য অভিজ্ঞ শিক্ষক/প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে নিয়মিত অনুশীলনের ব্যবস্থা করতে হবে। খেলাধুলার মাধ্যমে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, দলগত চেতনা ও সুস্থ জীবনধারার বিকাশে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। টুর্নামেন্ট সংক্রান্ত পরবর্তী নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, আগামী ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে সকল প্রতিষ্ঠানে ফুটবল দল গঠন পূর্বক বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত মেইলে প্রেরণ করতে হবে। উপর্যুক্ত বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, স্থানীয় ক্রীড়ানুরাগী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও শিক্ষানুরাগীদের সম্পৃক্ত করে প্রাইম মিনিস্টার্স গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট-২০২৬ সফলভাবে বাস্তবায়নে আন্তরিক সহযোগিতা প্রদানের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। বিষয়টি অতীব জরুরি বলেও বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।

মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্য অবশ্যই খেলাধূলার প্রয়োজন আছে। তবে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সরকারের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত? দক্ষ আরবি ভাষা শিক্ষা, কুরআন-হাদিস গবেষণা, তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা, বিজ্ঞান গবেষণা, কর্মসংস্থানমুখী প্রশিক্ষণ, আধুনিক লাইব্রেরি ও গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি। শিক্ষার্থীদের শারীরিক সুস্থতার উদ্দেশ্যই যদি মূল লক্ষ্য হয়, তবে শালীন পরিবেশে বিকল্প কার্যক্রম বিবেচনা করা যেতে পারে— ইসলামিক স্কলার

মাদ্রাসা বোর্ডের এমন নির্দেশনার পর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। তারা বলছেন, যেখানে সতর ঢেকে রাখা ইসলামের একটি ফরজ বিধান, সেখানে মাদ্রসা ছাত্রীদের ফুটবল খেলায় অংশ নেওয়া অনৈতিক। তাদের দাবি, মাদ্রাসা বোর্ডের এমন বিতর্কিত নির্দেশনা প্রত্যাহার করা উচিত।

শিক্ষাবিদরা বলেন, মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা ইসলামী আদর্শ ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। সেখানে কোনো কর্মসূচি গ্রহণের আগে ধর্মীয় ও সামাজিক সংবেদনশীলতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ক্রীড়া কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে এমন আয়োজন বেছে নেওয়া যেতে পারে, যা মাদ্রাসা শিক্ষার বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়।

ইসলামী শিক্ষাবিদরা হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, নারী আবৃত রাখার বিষয়। সে যখন বের হয়, তখন শয়তান তাকে (মানুষের দৃষ্টিতে) আকর্ষণীয় করে তোলে। এটি প্রখ্যাত হাদিস গ্রন্থ জামে তিরমিযিতে বর্ণিত হয়েছে। ফলে এভাবে মেয়েদের প্রদর্শন ইসলামের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

তারা আরও বলেন, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্য অবশ্যই খেলাধূলার প্রয়োজন আছে। তবে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সরকারের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত? দক্ষ আরবি ভাষা শিক্ষা, কুরআন-হাদিস গবেষণা, তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা, বিজ্ঞান গবেষণা, কর্মসংস্থানমুখী প্রশিক্ষণ, আধুনিক লাইব্রেরি ও গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি। শিক্ষার্থীদের শারীরিক সুস্থতার উদ্দেশ্যই যদি মূল লক্ষ্য হয়, তবে শালীন পরিবেশে বিকল্প কার্যক্রম বিবেচনা করা যেতে পারে বলেও মনে করছেন তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন মাদ্রাসা শিক্ষক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য খেলাধুলার সুযোগ থাকা প্রয়োজন। তবে সেটি এমনভাবে আয়োজন করা উচিত, যাতে ধর্মীয় মূল্যবোধ, শালীনতা এবং প্রতিষ্ঠানের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন থাকে।

ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার প্রভাষক (ইসলামী শিক্ষা) নাজমুল হক আকন্দ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার আলিয়া মাদ্রাসার দাখিল ও আলিম স্তরের ছাত্রীদের জন্য ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছে। বিষয়টি মারাত্মক উদ্বেগজনক। যদিও প্রথম দৃষ্টিতে এটি ক্রীড়া উন্নয়নের একটি পদক্ষেপ মনে হতে পারে, কিন্তু যে শিক্ষাব্যবস্থা ইসলামি মূল্যবোধ, শালীনতা ও দ্বীনি চরিত্র গঠনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত, সেখানে এমন উদ্যোগ অনেকের কাছে নানান প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আলিয়া মাদ্রাসা কেবল একটি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি ইসলামী আদর্শ, পর্দা, লজ্জাশীলতা এবং নৈতিকতার শিক্ষা দেওয়া হয়। তাই এখানকার যেকোনো কার্যক্রমও সেই আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। ইসলামে নারীর স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও খেলাধুলার বিরোধিতা করা হয় না। বরং সুস্থ দেহ ও সুস্থ মনের গুরুত্ব ইসলাম স্বীকার করে। কিন্তু খেলাধুলার ধরন, পরিবেশ, পোশাক ও সামাজিক প্রভাব— এসব বিষয়ও ইসলামী শরিয়তের আলোকে বিবেচ্য। প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল খেলায় সাধারণত দৌড়ঝাঁপ, শারীরিক সংঘর্ষ এবং এমন পোশাক ব্যবহৃত হয়, যা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে মাদ্রাসার শিক্ষার পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’

তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ড. খলিলুর রহমান মাদানি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘শরীর চর্চা শরিয়ত সম্মত, তবে পর্দা এবং সতর রক্ষা করা ফরজ বিধান। এটি মেয়েদের জন্য যেমন, তেমনি ছেলেদের জন্যও প্রযোজ্য। তবে আমাদের কন্যাদের বিষয়টা গুরুত্বসহকারে দেখা উচিত।’

তিনি বলেন, ‘তাদের খেলাধূলায় বা শরীর চর্চায় বাধা নেই। এটি তাদের জন্য উপকারী। তবে তা তাদের নিজস্ব পরিমণ্ডলে হতে হবে। সবগুলো মাদ্রাসার এই সক্ষমতা রয়েছে কিনা সেটি বিবেচ্য বিষয়। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে শিক্ষার যে স্পিরিট, তা এই আদেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আমরা নোটিশপ্রাপ্তির পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে রিভিউ করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছি।’

বিষয়টি নিয়ে জানতে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমানকে একাধিকবার কল দিলেও তিনি ফোন ধরেননি।


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url